পেকুয়া প্রতিনিধি;
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে অবাধে বনজ গাছ কেটে পাচারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এবার বন পাহারাদারদের হাতে আটক একটি গাছবোঝাই টলি গাড়ি জব্দ না করে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের এক বিট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বন বিভাগের ভূমিকা নিয়ে এলাকাজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল টৈটং ইউনিয়নের কেরুণছড়ি এলাকা থেকে অবৈধভাবে কাটা বনজ গাছ একটি টলি গাড়িতে করে পাচার করা হচ্ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, হাসানের ঝুম এলাকার আবদুল হকের ছেলে মনু এবং সরকারমোরা এলাকার কালু এসব গাছ পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। টলি গাড়িটি চালাচ্ছিলেন লাল মিয়া।
বন পাহারাদার সর্দার ফিরোজ হাসানের ঝুম ব্রিজের ওপর গাড়িটি আটক করে বিষয়টি টৈটং বিট কর্মকর্তা মোতালেব আল মোমিনকে জানান। পরে বিট কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে এসে গাড়িটি বিট অফিসে নেওয়ার কথা বললেও সেটি জব্দ না করে পাচারকারীদের কাছে ছেড়ে দেন বলে অভিযোগ করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে, সদ্য কেটে ফেলা বড় বড় বনজ গাছের গোড়া এখনো মাটিতে পড়ে রয়েছে। অনেক স্থানে কাটা গাছের গুঁড়ি সরিয়ে নেওয়া হলেও গোড়ার অংশ রয়ে গেছে, যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় সম্প্রতি এসব গাছ কাটা হয়েছে। অন্যদিকে, একটি টলি গাড়িতে মোটা মোটা গাছের গুঁড়ি বহন করতেও দেখা গেছে।
সূত্র জানায়, স্থানীয় একটি কাঠ পাচার সিন্ডিকেট এবং কিছু অসাধু কাঠ ব্যবসায়ী এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিনই টমটম, টলি ও সিএনজিচালিত যানবাহনে করে পাহাড় থেকে কেটে আনা বনজ গাছ বিভিন্ন এলাকায় পাচার করা হচ্ছে। দিনের পাশাপাশি রাতের আঁধারেও এসব যানবাহনে কাঠ পরিবহন চললেও কার্যকর নজরদারি ও অভিযানের অভাবে পাচারকারীরা নির্বিঘ্নে গাছ সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত উজাড় হচ্ছে পাহাড়ের বনাঞ্চল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, টৈটং এলাকার অলী আহমদ ও কাশেম নামে দুই ব্যক্তিকে বিট কর্মকর্তা তাঁর অনানুষ্ঠানিক সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করেন। তাদের মাধ্যমে পাহাড়ে নতুন বসতি স্থাপন, বনজ গাছ কাটা, বালু উত্তোলন এবং পাহাড় কাটার মতো কর্মকাণ্ড থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রতিটি টমটমে বহন করা গাছের জন্য ২০০ টাকা এবং প্রতিটি টলি গাড়ির জন্য ৪০০ টাকা করে মাসোহারা আদায় করা হয়। এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করলে স্থানীয়দের বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের কারণেই টমটম, টলি ও সিএনজিতে কাঠ পাচারের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
এছাড়া টৈটং গর্জনিয়া পাড়ায় মো. করিম নামে এক ব্যক্তি সংরক্ষিত বনভূমিতে পাকা ভবন নির্মাণ করলেও বিট কর্মকর্তা কোনো ব্যবস্থা নেননি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও নতুন বসতি গড়ে উঠছে, পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি হচ্ছে এবং বনজ গাছ উজাড় করা হচ্ছে। অথচ প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বিপরীতে অসহায় মানুষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় এলাকায় বিট কর্মকর্তাকে নিয়ে ‘শক্তের ভক্ত, নরমের যম’—এমন মন্তব্যও শোনা যাচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় টৈটংয়ের পাহাড়জুড়ে সেগুন, গর্জনসহ বিভিন্ন প্রজাতির বনজ গাছের ঘন বন ছিল। বর্তমানে অধিকাংশ পাহাড়ে শুধু কাটা গাছের গোড়া দেখা যায়, গাছ নেই। কোথাও কোথাও গাছ কাটার পর প্রমাণ নষ্ট করতে গোড়া উপড়ে ফেলা বা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গাছের গোড়া আছে, কিন্তু গাছ নেই; নামে আছে বন, বাস্তবে সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড় থেকে। বন বিভাগের নীরবতা ও দুর্বল নজরদারির সুযোগেই বন উজাড় ও কাঠ পাচার দিন দিন বেড়ে চলেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বন পাহারাদার সর্দার ফিরোজ বলেন, “আমি একটি গাছবোঝাই টলি গাড়ি আটক করে বিট কর্মকর্তাকে খবর দিই। তিনি ঘটনাস্থলে এসে গাড়িটি বিট অফিসে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে হাসানের ঝুম ব্রিজ থেকে নিয়ে যান। তখন তাঁর সঙ্গে কাশেম নামে একজন ছিলেন। পরে জানতে পারি, গাড়িটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এভাবে যদি বন বিভাগের লোকজনই গাছ পাচারকারীদের সহযোগিতা করেন, তাহলে পাহাড়ের বন কীভাবে রক্ষা হবে?”
তবে টৈটং বিট কর্মকর্তা মোতালেব আল মোমিন তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমি এমন কোনো গাড়ি আটক করিনি। তাই ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।”
এদিকে বন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, টমটম, টলি ও সিএনজিতে করে প্রতিনিয়ত পাহাড় থেকে কেটে আনা বনজ গাছ পাচার বন্ধে দ্রুত অভিযান পরিচালনা, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বন বিভাগের ভূমিকার নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে অচিরেই টৈটংয়ের পাহাড় থেকে অবশিষ্ট বনও বিলীন হয়ে যাবে।
